আমেরিকায় গ্রেফতার রুশ গোয়েন্দা- তা নিয়ে একটি কবিতা

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ ‘রয়ালপিন্ডি ষড়যন্ত্র’ মামলায় জেলে বসে একটি কবিতা লিখেছিলেন,

”তেরে হোঁঠো কি চাহাত মে হাম
দার কি খুশক টেহনি পে মারে গায়ে।
তেরে হাথো কি শাম্মা কি হাসরাতো মে হাম
নিম-তারিক রাহো মে মারে গায়ে…”

‘তোর ঠোঁটের ফুলের ভালোবাসায় আমরা
ফাঁসির শুকনো ডালে ঝুলে গেছি।
তোর হাতে ধরা মশালের* বেদনায় আমরা
আবছা আঁধার গলিতে মরে গেছি।
আমাদের ঠোঁট থেকে বহুদূরে শূলিতে
তোর ঠোঁটের লালিমা জ্বলছে।
তোর কেশের মাদকতা বর্ষণ হচ্ছে,
তোর হাতের রুপা দীপ্তি ছড়াচ্ছে।

যখন তোর পথে মিশেছে জুলুমের সন্ধ্যা,
আমরা চলে এসেছি; যতদূর এনেছে আমাদের কদম।
ঠোঁটে গজলের শব্দ; হৃদয়ে বেদনার ঝাড়বাতি,
আপন বেদনা ছিল তোর সৌন্দর্যের সাক্ষ্য,
দেখিস কায়েম রব এই সাক্ষ্যতে আমরা।
আমরা যে আঁধার গলিতে মরে গেছি।

ব্যর্থতা যদি আমার অদৃষ্ট ছিলো
তোর প্রতি প্রেম তো তবে আপন প্রচেষ্টা ছিলো।
কার আপত্তি আছে, যদি প্রেমের তরে বিচ্ছেদের মৃত্যুকূপে গিয়ে সবাই একত্র হই।
মৃত্যুকূপ থেকে আমাদের পতাকা বেছে নিয়ে
বের হবে প্রেমিকদের কাফেলা,
যাদের আকাঙ্ক্ষার পথে আমাদের কদম দুঃখের দূরত্ব সংক্ষিপ্ত করে চলছে।
যার খাতিরে বিশ্বজয় করে চলছি আমরা প্রাণ ত্যাগ করেও,
তোর প্রেমময়তায় আমরা আঁধার রাস্তায় মরে গেছি।’

[*আমেরিকার ‘স্ট্যাচু অব লিবার্টি’ যা সাম্যের প্রতীকস্বরূপ।]

কেন ফয়েজ এই কবিতাটি লিখেছেন?
কেন এই কবিতার অনুবাদ সারা বিশ্বে এত জনপ্রিয়?
কী মহত্ত এই কবিতার?

সকল প্রশ্নের জবাব খোঁজে নিন প্রোবাংলায়-

ঘটনাটির পটভূমি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমেরিকার। সেই সময় আমেরিকায় বিশেষ এক অবস্থা বিরাজমান ছিলো। এই অবস্থাকে ‘ম্যাকারথিজম’ নামে স্মরণ করা হয়। এটাকে এক আমেরিকান সিনেটর ম্যাকারথিন নেতৃত্ব দিতো। ম্যাকারথিন খুব পারদর্শী ভাবে আমেরিকানদের কাছে কমিউনিজমকে দেশ বিরোধী ও ঘৃণার বস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিলো।

বর্তমানে অগণতান্ত্রিক দেশগুলোতে দেশপ্রেমিক শুধুমাত্র তাকেই বলা হয় যারা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের অনুসারী হয়। তেমনিভাবে ওই সময় যে আমেরিকাকে ভালবাসবে তাকে অবশ্যই কমিউনিজমকে ঘৃণা করতে হবে। কমিউনিজমকে যে পছন্দ করবে বা সে সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করবে তারা আমেরিকার শত্রু। এমনই এক নিয়ম তৈরি হয় আমেরিকায়। যদিও আমেরিকার সংবিধান দাবি করে যে, আমেরিকায় বিভিন্ন মতাদর্শের মানুষ থাকতে পারবে এবং শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। এমনকি তাদেরকে পূর্ণ নিরাপত্তা দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল একদম ভিন্ন।

‘ম্যাকারথিজমের’ এর প্রবক্তা ম্যাকারথিন F.B.I এর সাহায্য পেতো। একসময় সে আমেরিকান ইন্টালিজেন্টেও কাজ করতো। সে একটি তালিকা বানিয়েছিল যাতে শতাধিক সরকারি অফিসারদের নাম ছিলো, যাদেরকে আমেরিকার প্রতি বিশ্বস্ত নয় অর্থাৎ সন্দেহভাজন রুশ গোয়েন্দা সাব্যস্ত করা হয়। যদিও এটার পক্ষে কোনো সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।

এটা তখন চরম সীমা অতিক্রম করে, যখন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ‘ট্রুম্যান’ এর স্বাক্ষর করা এক ফরমান জারি হয়। যাতে তালিকাভুক্ত অফিসারদের নতুন করে দেশপ্রেম প্রমাণ করতে হবে। এটাকে বলা হতো ‘লয়ালিটি রিভিউ’।

এই তালিকা প্রকাশের ফলে শতাধিক নিরীহ মানুষকে চাকরীচ্যুত ও কিছু মানুষকে প্রাণ ত্যাগ করতে হলো। তখন কাউকে গ্রেফতার করতে হলে প্রমাণ নয়, শুধু অপবাদ বা অভিযোগের দরকার ছিলো। যেমনটা ফরাসি বিপ্লবের পর ঘটে ছিল। যাকে “রেইন অব টেরর” নামে ইতিহাসের পাতায় লিখে রাখা হয়েছে।

এই ম্যাকারথিজমের শিকার হতো ব্যাবসায়ী, চিকিৎসক, হলিউড অভিনেতা ও পরিচালক। এমনকি বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের দিকেও তীর ছোড়া হয়েছে। চার্লি অভিনয়ের জন্য ক্যালিফোর্নিয়ার হলিউডে আসতো। তাঁকে তাঁর নিরপেক্ষ মতাদর্শের জন্য রুশ গোয়েন্দা বা কমিউনিস্ট ভাবা হতো এবং নানান ভাবে হয়রানি করা হতো।

উনি ১৯৫৩ সালে প্রেসের মাধ্যমে তার অভিমানের কথা জানান এবং একেবারের জন্য সুইজারল্যান্ডে চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।

এই ম্যাকারথিজম এতই প্রভাব বিস্তার করেছিল যে, পোলিও ভ্যাকসিনটাও রুশ ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা হতো। অভিযোগ ছিল এই পোলিও ভ্যাকসিনের মাধ্যমে রাশিয়া আমেরিকানদের মানসিক ও শারীরিকভাবে পঙ্গু করতে চায়।

তৎকালীন সময়ে আমেরিকা ও সোভিয়েত রুশ পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তারের জন্য নতুন নতুন মারাত্মক ও ধ্বংসযজ্ঞ অস্ত্র তৈরিতে লিপ্ত হয়। ব্রিটেনের কাছ থেকে আমেরিকা খবর পায়, আমেরিকার কিছু বিজ্ঞানী রুশ গোয়েন্দা বা সোভিয়েত ইউনিয়নের হয়ে কাজ করছে। এমন এক অভিযোগের বাণ গিয়ে পড়ে ‘মেন হেটান’ প্রজেক্টের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ‘ডেভিথ গ্রীন গ্লাস’ এর ওপর। এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্ট ছিলো। কারণ এখানে আমেরিকা এটম বোম তৈরি করেছিলো। ডেভিথ গ্রীন গ্লাস সেই প্রজেক্টের খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি নকশা রুশ গোয়েন্দার কাছে পাচার করেছে এমন তথ্য পায় আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা।

যখন তাকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়, তখন সে তার বোনের কথা বলে। সে তার বোন ‘এথেল রোজেনবার্গ’ এর প্ররোচনায় এটা করেছে। এথেল রোজেনবার্গ তাঁর স্বামী জুলিয়াস রোজেনবার্গ-এর কথাতেই নিজ ভাইয়ের মাধ্যমে এই কাজ করিয়েছিলো।

আমেরিকান গোয়েন্দা সংস্থা এই তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ করে। যদিও অনেকে বলছে এটা নিরপেক্ষ তদন্ত নয়।

স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই গ্রেফতার করে প্রচুর জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। কিন্তু তারা বারবার দোষ স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিলো।

আমেরিকান আদালত কলে কৌশলে বিভিন্ন ভাবে এটা প্রমাণ করলো যে, তাঁরা দুইজন রুশ গোয়েন্দা। বিচারকের কাছে দুইটি অপশন ছিলো।

১. ত্রিশ বছরের কারাদণ্ড।
২. বৈদ্যুতিক চেয়ারে বৈদ্যুতিক শকের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড।

১৯৫১ সালের ৫ এপ্রিল মিস্টার ও মিসেস রোজেনবার্গকে মৃত্যুদণ্ড ও ডেভিথ গ্রীন গ্লাসকে ১৫ বছরের কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। এই রায়ের বিরোধিতা করে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে।

মৃত্যুদণ্ড

উনাদের দুটি ছেলে ছিল। একজনের বয়স আট ও অন্যজনের বয়স চার। রোজেনবার্গ ও তাঁদের বাচ্চাদের ছবি হাতে নিয়ে হোয়াইট হাউজের সামনে মানুষেরা বিক্ষোভ করে। আইনস্টাইন, পাবলো পিকাসো ও পোপ পাইস টুয়েলভ মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহারের আবেদন জানায়।

অতঃপর ১৯ জুন ১৯৫৩। রাত ১:৪৩ মিনিটে তাদের মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন হয়। মৃত্যুর আগে স্বামী-স্ত্রী দুজনকে আধা ঘন্টার জন্য সাক্ষাতের সময় দেওয়া হয়েছিলো। তারা তাদের সন্তানের জন্য একটি চিঠি লিখে যান। চিঠিতে লিখেন, “এটা ঠিক যে দুনিয়াতে ভালো ও ইনসাফ নেই। কিন্তু জীবন এতোটুকু যোগ্য যে এখানে বাঁচা যায়। বাচ্চারা তোমরা সর্বদা মনে রাখবে তোমার মা-বাবা নিরপরাধ ছিলো।”

মৃত্যুর আগে তাদেরকে শেষবারের মতো জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো। তাদেরকে বলা হলো, তারা যদি দোষ স্বীকার করে ও বাকি রুশ গোয়েন্দাদের নাম বলে তবে ক্ষমা পেতে পারে। কিন্তু তারা দোষ স্বীকারে অস্বীকৃতি জানান।

প্রথমে স্বামী জুলিয়াস রোজেনবার্গকে বৈদ্যুতিক চেয়ারে বসানো হয়। তিনি বিদ্যুতের একটি মাত্র ঝটকায় মারা যান। একই চেয়ারে স্ত্রী এথেল রোজেনবার্গকে বসানো হয়। উনাকে পাঁচবার বিদ্যুতের ঝটকা দেওয়ার পর উনি মারা যান।

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ কমিউনিস্ট মতাদর্শের ছিলেন। তিনি যখন জেলখানায় বসে পত্রিকাতে এই খবর পাঠ করেন। তখন তার হাতের কলম আর থেমে থাকেনি। দুটি নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুর ঘটনাকে সাহিত্যের পাতায় অমর করে দিয়েছেন ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ।

ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ
ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ

আসলেই কি তারা নিরপরাধ ছিলেন?

মৃত্যুর আগে তাঁরা তাঁদের সন্তানদের উদ্দেশ্যে যে চিঠি লিখে গিয়েছিলেন, সেখানে তারা নিজেদের নিরপরাধ দাবি করছেন। এছাড়া ওটা ছিল ম্যাকারথিজমের যুগ। রুশ-আমেরিকার স্নায়যুদ্ধের যুগ। দুটি পরাশক্তি একে অপরকে পরাস্ত করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। পারমাণবিক বোমা তৈরির প্রতিযোগিতায় মেতে ছিল। সেই প্রতিযোগিতায় কোনো নীতি-নৈতিকতার বালাই ছিল না। উন্মদের মতো মানব হত্যাযজ্ঞে লিপ্ত ছিল দুই দানব। তাদের এই যুদ্ধের পরিনাম ভোগ করেছে লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষ। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ভিয়েতনাম।

এভাবেই যুগে যুগে নিরীহ মানুষের রক্তে রঙিন হয় সাম্রাজ্যবাদীদের মহল।

এই কবিতা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘ফয়েজ ফেস্টিভেল’ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বিভিন্ন দেশের সাহিত্যপ্রেমীরা অংশগ্রহণ করে। অনুষ্ঠানে যখন এই কবিতা পাঠ করা হয়, মানুষের কৌতূহলী মন প্রশ্ন করে, এই কবিতার পেছনের দৃশ্য কী? সেটা অনুসন্ধান করতেই বেরিয়ে আসে সাম্রাজ্যবাদীদের হিংস্র চেহারা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *