ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ ও বিশ্বকাপের ইতিহাস

ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২: নিঃসন্দেহে বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলাটির নাম ফুটবল। বিশ্বব্যাপী প্রায় সব দেশেই এই খেলার কমবেশি জনপ্রিয়তা আছে। এই জনপ্রিয়তা থেকেই আঁচ করা যায়, ক্রীড়াজগতের সবচেয়ে বড় উন্মাদনার নাম ফুটবল বিশ্বকাপ। সেই উন্মাদনা ছাপিয়ে যায় দেশ-জাতি-ধর্ম-বর্ণ আর সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে। আমাদের বাংলাদেশও এই উন্মাদনার বাইরে না। ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই এদেশের অলিতে গলিতে, বাসার ছাদে উড়তে দেখা যায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানি-ফ্রান্স ইত্যাদি দেশের পতাকা। বিশ্বকাপ জ্বরে মাতোয়ারা হয় পুরো দুনিয়া। চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বকাপ ফুটবল।

বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাস

বিশ্বব্যাপী ফুটবলের নিয়ন্ত্রক বা অভিভাবক সংস্থা হচ্ছে আন্তর্জাতিক ফুটবল সংস্থা- ফিফা (FIFA)। ১৯৩০ সাল থেকে প্রতি চার বছর পরপর ফিফার তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ফুটবল বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপের শুরুটা মূলত ১৯৩২ সালের অলিম্পিকে ফুটবলকে বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে। ১৯৩২ সালের অলিম্পিক গেমস আয়োজিত হয় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলসে। আমেরিকাতে ফুটবল তেমন একটা জনপ্রিয় না হওয়ার কারণেই মূলত ফুটবলকে অলিম্পিক থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে ফিফার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে বিশ্বকাপ আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন।

কিন্তু সমস্যা দেখা যায় বিশ্বকাপে খেলতে আগ্রহী এমন দল খুঁজতে গিয়ে। যাতায়াতের সমস্যা ও অন্যান্য খরচ অনেক বেশি হওয়ায় ফুটবল খেলুড়ে অনেক দেশই বিশ্বকাপে অংশগ্রহণে আপত্তি জানায়। ফলে মাত্র ১৩ টি দল নিয়েই বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় সেবছর। এর পরের দুই আসর বসে ইউরোপে। দক্ষিণ আমেরিকার কিছু দল আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও যাতায়াত ও যুদ্ধবিগ্রহের সমস্যার জন্য অংশগ্রহণ করতে পারে নি। এই দুই বিশ্বকাপে একমাত্র ব্রাজিলই দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব করে। এর পরে ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের জন্য দুইটি আসর অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫০ সালে আবার আসর দক্ষিণ আমেরিকায়। এবারে স্বাগতিক ব্রাজিল। এবারেও যোগাযোগের সমস্যা্র জন্য কিছু দল নাম প্রত্যাহার করে নেয়।

১৯৩৪ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বকাপে ১৬টি দল অংশগ্রহণ করতো। এর মধ্যে শুধু ১৯৩৮ সালে ১৫ টি দল ও ১৯৫০ সালে ১৩ টি দল অংশগ্রহণ করে। ১৯৮২ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ২৪ টি দলের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। এরপরে ১৯৯৮ সাল থেকে ৩২ টি দল নিয়ে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। সামনের ২০২২ বিশ্বকাপই হবে শেষ বিশ্বকাপ যাতে ৩২ টি দল অংশগ্রহণ করবে। এর পর থেকে ৪৮ দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকাপ। মূলত ফুটবলকে সার্বজনীন খেলায় রূপান্তরিত ও জনপ্রিয় করার উদ্দেশ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ১৯৩০ থেকে এই পর্যন্ত মোট ২১ বার বসেছে এই আসর।

বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজক দেশসমূহ

প্রথম বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৩০ সালে। উরুগুয়েতে আয়োজিত হয় এই বিশ্বকাপ। এর পরে ১৯৩৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ইতালিতে ১৬ টি দলের অংশগ্রহণে। ১৯৩৮ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। এর পরের ১৯৪২ ও ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অনুষ্ঠিত হয়নি। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ব্রাজিলে। ১৯৫৪ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় সুইজারল্যান্ডে। ১৯৫৮ সালে অনুষ্ঠিত হয় সুইডেনে। ১৯৬২ সালের বিশ্বকাপ আয়োজন করে চিলি। ১৯৬৬ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজন করে ফুটবলের জন্মদাতা দেশ ইংল্যান্ড। ১৯৭০ সালে আয়োজন করে মেক্সিকো।

১৯৭৪ সালের আয়োজক ছিল জার্মানি। ১৯৭৮ সালের আসর বসে আর্জেন্টিনায়। ১৯৮২ সালে অনুষ্ঠিত হয় স্পেনে। ১৯৮৬ সালে দ্বিতীয়বারের মত ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করে মেক্সিকো। ১৯৯০ সালে আবার ইতালি। ১৯৯৪ সালের আয়োজক ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় ফ্রান্সে। ২০০২ বিশ্বকাপ যৌথভাবে আয়োজন করে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। ২০০৬ সালে আয়োজন করে জার্মানি। ২০১০ সালের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকায়। ২০১৪ সালে ব্রাজিল এবং সর্বশেষ ২০১৮ সালে আয়োজন করে রাশিয়া। এক নজরে দেখে নিই আয়োজক দেশগুলোর নাম-

সাল আয়োজক অংশগ্রহণকারী দল
১৯৩০ উরুগুয়ে ১৩
১৯৩৪ ইতালি ১৬
১৯৩৮ ফ্রান্স ১৫
১৯৫০ ব্রাজিল ১৩
১৯৫৪ সুইজারল্যান্ড ১৬
১৯৫৮ সুইডেন ১৬
১৯৬২ চিলি ১৬
১৯৬৬ ইংল্যান্ড ১৬
১৯৭০ মেক্সিকো ১৬
১৯৭৪ জার্মানি ১৬
১৯৭৮ আর্জেন্টিনা ১৬
১৯৮২ স্পেন ২৪
১৯৮৬ মেক্সিকো ২৪
১৯৯০ ইতালি ২৪
১৯৯৪ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২৪
১৯৯৮ ফ্রান্স ৩২
২০০২ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া ৩২
২০০৬ জার্মানি ৩২
২০১০ দক্ষিণ আফ্রিকা ৩২
২০১৪ ব্রাজিল ৩২
২০১৮ রাশিয়া ৩২
২০২২ কাতার ৩২

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার জয়ী হওয়া দেশ

এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২১ টি আসরে মোট ৭৮ টি দেশ বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ পেলেও ফাইনালে উঠতে পেরেছে মাত্র ১১ টি দেশ। আর এর মধ্যে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে মাত্র ৮ টি দেশ।

এর মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চ পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ব্রাজিল। চারবার করে বিশ্বকাপ পেয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে জার্মানি ও ইতালি। দুইবার করে বিশ্বকাপ জয় করেছে আর্জেন্টিনা, ফ্রান্স ও উরুগুয়ে। ইংল্যান্ড ও স্পেন এক বার করে বিশ্বকাপ জিতেছে। নিচের ছকে দেখে নিই কোন সালে কোন দল চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ হয়েছে।

এক নজরে বিশ্বকাপ ফুটবলের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্স আপ দল

সাল চ্যাম্পিয়ন রানার্স আপ
১৯৩০ উরুগুয়ে আর্জেন্টিনা
১৯৩৪ ইতালি চেকোস্লোভাকিয়া
১৯৩৮ ইতালি হাঙ্গেরি
১৯৫০ উরুগুয়ে ব্রাজিল
১৯৫৪ পশ্চিম জার্মানি হাঙ্গেরি
১৯৫৮ ব্রাজিল সুইডেন
১৯৬২ ব্রাজিল চেকোস্লোভাকিয়া
১৯৬৬ ইংল্যান্ড পশ্চিম জার্মানি
১৯৭০ ব্রাজিল ইতালি
১৯৭৪ পশ্চিম জার্মানি নেদারল্যান্ড
১৯৭৮ আর্জেন্টিনা নেদারল্যান্ড
১৯৮২ ইতালি পশ্চিম জার্মানি
১৯৮৬ আর্জেন্টিনা পশ্চিম জার্মানি
১৯৯০ পশ্চিম জার্মানি আর্জেন্টিনা
১৯৯৪ ব্রাজিল ইতালি
১৯৯৮ ফ্রান্স ব্রাজিল
২০০২ ব্রাজিল জার্মানি
২০০৬ ইতালি ফ্রান্স
২০১০ স্পেন নেদারল্যান্ড
২০১৪ জার্মানি আর্জেন্টিনা
২০১৮ ফ্রান্স ক্রোয়েশিয়া

প্রতিযোগিতার সাধারণ নিয়মকানুন

বিশ্বকাপ ফুটবল দুইটি ধাপে অনুষ্ঠিত হয়। বাছাই পর্ব আর চূড়ান্ত পর্ব। বিশ্বকাপের আগের তিন বছরে ফিফা স্বীকৃত দেশগুলো বাছাই পর্বে অংশগ্রহণ করে। এই বাছাই পর্ব থেকে সেরা ৩২টি দল অংশগ্রহন করে চূড়ান্ত পর্বে। মূলত ৩১ টি দল বাছাই পর্বের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। বাকি একটি দল স্বাগতিক হিসেবে সরাসরি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সুযোগ পায়।

বিশ্বকাপের পুরস্কারসমূহ

বিশ্বকাপের শুধু একটিই পুরস্কার নয়, দলগত অর্জনের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অর্জনের জন্যও রয়েছে বেশকিছু পুরস্কার। এগুলো হল-

  • অ্যাডিডাস গোল্ডেন বুটঃ সর্বোচ্চ সংখ্যক গোলদাতাকে দেওয়া হয় এই পুরস্কার। ১৯৩০ সাল থেকেই এ পুরস্কার দেওয়া হয়। প্রাথমিকভাবে গোল্ডেন বুটই দেওয়া হলেও বর্তমানে সিলভার বুট এবং ব্রোঞ্জ বুটও দেওয়া হয়।
  • অ্যাডিডাস গোল্ডেন বলঃ সেরা খেলোয়াড়কে অ্যাডিডাস গোল্ডেন বল পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৮২ থেকে এই পুরস্কারের প্রচলন হয়। পরবর্তীতে সিল্ভার বল ও ব্রোঞ্জ বলও দেওয়া হয়।
  • গোল্ডেন গ্লাভসঃ ১৯৯৪ সাল থেকে সেরা গোলরক্ষককে দেওয়া হয় এই পুরস্কার।
  • শ্রেষ্ঠ উদীয়মান খেলোয়াড়ঃ ২০০৬ সাল থেকে অনুর্ধ্ব ২১ বছর বয়সী সেরা খেলোয়াড়কে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
  • ফেয়ার প্লে ট্রফিঃ যারা ফেয়ার-প্লে অর্থাৎ মার্জিত খেলার মাধ্যমে দ্বিতীয় রাউন্ডে উঠতে সক্ষম হয় তাদেরকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৭০ সাল থেকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়ে থাকে।
  • ম্যান অফ দ্যা ম্যাচঃ প্রতি ম্যাচে অসাধারণ পারফরম্যান্স করা খেলোয়াড়কে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।

বিশ্বকাপের মাসকট

১৯৬৬ বিশ্বকাপ থেকে মাসকট বা প্রতীকের প্রচলন শুরু হয়। এক নজরে দেখে নিই বিশ্বকাপের মাসকটগুলো-

সাল মাসকট
১৯৬৬ ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি
১৯৭০ জুয়ানিতো
১৯৭৪ টিপ অ্যান্ড ট্যাপ
১৯৭৮ গাওচিতো
১৯৮২ নারানজিতো
১৯৮৬ পিকু
১৯৯০ সিয়াও
১৯৯৪ স্ট্রাইকার
১৯৯৮ ফুটিক্স
২০০২ আতো, কাজ ও নিক
২০০৬ ষষ্ঠ গোলিও ও পাইল
২০১০ জাকুমি
২০১৪ ফুলেকো
২০১৮ জাবিভাকা

বিশ্বকাপের কিছু স্মরণীয় এবং ঐতিহাসিক মুহূর্ত

ম্যারাডোনার ঈশ্বরের হাতঃ ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লাইন্সম্যান ও রেফারির চোখকে ফাঁকি দিয়ে ঢুঁস মেরে গোল করেন আর একই সাথে হেড নেওয়ার ভঙ্গি করেন। ফলে হেড থেকেই গোল হয়েছে বলে মনে হয় সবার। পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনে ম্যারাডোনা একে ঈশ্বরের হাতে দেওয়া গোল বলে অভিহিত করেন। “হ্যান্ড অফ গড” বা ঈশ্বরের হাত নামে এই গোল বহুল পরিচিত।

  • গোল অফ দ্যা সেঞ্চুরিঃ একই ম্যাচে ম্যারাডোনা আরেকটি চমৎকার গোল করেন যা শতাব্দীর সেরা গোল বা গোল অব দ্যা সেঞ্চুরি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
  • জিদানের ঢুঁসঃ ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের ফাইনালে ফ্রান্সের হয়ে খেলতে নামা জিনেদিন জিদান প্রতিপক্ষ ইতালির মার্কো মাতেরাজ্জিকে ঢুঁস মারেন। ফলাফল লাল কার্ড পান জিদান এবং একই সাথে ফ্রান্সও হেরে যায় ফাইনাল।
  • ব্রাজিল বনাম জার্মানির ম্যাচঃ ২০১৪ সালের বিশ্বকাপে স্বাগতিক দল হিসেবে টুর্নামেন্টে হট ফেভারিট দল ছিল ব্রাজিল। সেমিফাইনালে জার্মানির মুখোমুখি হয় ব্রাজিল। এর আগে ইনজুরির কারণে ব্রাজিলের তারকা খেলোয়াড় নেইমার দল থেকে ছিটকে পড়ায় নেইমারবিহীন ব্রাজিল নখদন্তহীন হয়ে পড়ে। ফলে জার্মানির কাছে ৭-১ ব্যবধানে হারে ব্রাজিল যা তাদের দলগত রেকর্ডে অত্যন্ত শোচনীয় ও লজ্জাজনক। পুরো ফুটবলবিশ্ব বিস্মিত হয়ে যায় এই খেলায়।
  • ১৯৫০ বিশ্বকাপের ফাইনালঃ ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে চিরায়ত কোনো ফাইনাল ছিল না। যেটি ছিল তা হচ্ছে চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণী ম্যাচ। ব্রাজিল উরুগুয়ের থেকে পয়েন্ট ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। ফলে ম্যাচ ড্র করতে পারলেও ব্রাজিল চ্যাম্পিয়ন হত। কিন্তু বিধিবাম! তারা ম্যাচ হেরে যায়। মারাকানা স্টেডিয়ামের ১,৭৪,০০০ দর্শক সাক্ষী থেকে যায় ঐতিহাসিক এই ম্যাচের।
  • পেলের বিশ্বকাপ জয়ঃ ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের ফাইনালে মুখোমুখি হয় ইতালি ও ব্রাজিল। সেই ম্যাচে কার্লোস আলবার্তো এবং পেলের অসাধারণ নৈপুণ্যে ৪-১ ব্যবধানে বিশাল জয় পায় ব্রাজিল।

বিশ্বকাপের যত রেকর্ড

  • বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার অংশগ্রহণকারী দল ব্রাজিল, এ অবধি আয়োজিত ২১ টি আসরের সবগুলো আসরেই তারা অংশগ্রহণ করেছে। এই বিরল খ্যাতি লাভ করা একমাত্র দল ব্রাজিল।
  • সবচেয়ে বেশিবার বিশ্বকাপ জয়ী দলের নামও ব্রাজিল। মোট ৫ বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ পেয়েছে ব্রাজিল।
  • বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছে জার্মানি। এ পর্যন্ত মোট ১০৬ ম্যাচ খেলেছে দেশটি।
  • বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশিবার ফাইনাল খেলা দলও জার্মানি, মোট ৮ বার ফাইনাল খেলতে সক্ষম হয়েছে তারা।
  • সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়ী দলও জার্মানি, এ পর্যন্ত মোট ৭৬ টি ম্যাচ জিতেছে তারা।
  • বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ হারা দল মেক্সিকো। এ পর্যন্ত ২৫ টি ম্যাচ হেরেছে তারা।
  • এ পর্যন্ত বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা দল ব্রাজিল। মোট ২২৯ বার তারা প্রতিপক্ষের জালে বল প্রবেশ করাতে পেরেছে।
  • বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি গোল হজম করা দল জার্মানি, মোট ১২১ গোল হজম করতে হয়েছে তাদের।
  • সবচেয়ে বেশিবার একটানা ফাইনাল খেলেছে ব্রাজিল ও জার্মানি। দুই দলই টানা তিনবার ফাইনাল খেলেছে।
  • বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি টানা ম্যাচ জয় করেছে ব্রাজিল। টানা ১১ ম্যাচ জেতার অনবদ্য রেকর্ডের মালিক তারা।
  • সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজিত দলটিও ব্রাজিল। টানা ১৩ ম্যাচ অপরাজিত ছিল তারা।
  • খেলোয়াড় হিসেবে সবচেয়ে বেশিবার বিশ্বকাপ জয় করেছেন পেলে। মোট তিনবার বিশ্বকাপ জয় করার সৌভাগ্য হয়েছে তার।
  • বিশ্বকাপে অধিনায়ক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলেছেন দিয়েগো ম্যারাডোনা, মোট ১৬ ম্যাচ খেলেছেন অধিনায়ক হিসেবে।
  • বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা হচ্ছেন পশ্চিম জার্মানির খেলোয়াড় মিরোস্লাভ ক্লোসা, মোট ১৬ টি গোল করেছেন তিনি।
  • সবচেয়ে বেশিবার বিশ্বকাপ খেলা খেলোয়াড় মোট তিন জন। মেক্সিকান খেলোয়াড় আন্তোনিও ক্যারবাজাল, ইতালিয়ান খেলোয়াড় জিয়ানলুইজি বুফন এবং জার্মানির লোথার ম্যাথিউস। প্রত্যেকে ৫ বার করে বিশ্বকাপে অংশগ্রহণ করেছেন।
  • বিশ্বকাপে সবচেয় দ্রুততম গোলদাতা তুরস্কের খেলোয়াড় হাকান শুকুর। ২০০২ সালে কোরিয়ার বিপক্ষে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে খেলা শুরুর মাত্র ১১ সেকেন্ডের মাথায় গোল করেন তিনি।
  • খেলোয়াড় ও কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ জিতেছেন দুইজন। ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার।

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর বাছাইপর্ব

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর জন্য বাছাইপর্ব শুরু হয় ২০১৯ সালের জুন মাসে। মোট ২১০ টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় বাছাইপর্ব। স্বাগতিক হিসেবে কাতার সরাসরি মূল পর্বে খেলার সু্যোগ পায়। বাকি ৩১ টি দল নির্ধারিত হবে বাছাইপর্ব দ্বারা। মাঝে কোভিড-১৯ মহামারীর জন্য খেলা বন্ধ ছিল বেশ কিছুদিন। মঙ্গোলিয়ান খেলোয়াড় নর্জমোগিন সেডেনবাল বাছাইপর্বের প্রথম গোলটি করেন। বাছাই পর্বের পরে এশিয়া থেকে ৪ বা ৫ টি দল, আফ্রিকান অঞ্চল থেকে ৫ টি, উত্তর আমেরিকা থেকে ৩ বা ৪ টি দল, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ৪ অথবা ৫ টি দল, ওশেনিয়া থেকে ০ অথবা ১ টি দল, ইউরোপ থেকে ১৩ টি দল মূলপর্বে খেলার সুযোগ পাবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২

২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফুটবল অনুষ্ঠিত হবে কাতারে। এটি বিশ্বকাপের ২২ তম আসর। জাপানের পরে দ্বিতীয় এশিয়ান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপ আয়োজন করতে যাচ্ছে কাতার। কাতারই সর্বপ্রথম বিশ্বকাপ আয়োজক মুসলিম দেশ। এর আগে সবগুলো বিশ্বকাপ জুন-জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত হলেও এবারের বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বর-ডিসেম্বরে। এতে অংশগ্রহণ করবে ৩২ টি দল। এবারই ৩২ দল নিয়ে শেষ বিশ্বকাপ। এর পরের বিশ্বকাপগুলো ৪৮টি দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৯ সালের জুন মাসে ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবলের জন্য বাছাই পর্ব শুরু হয়। এতে অংশ নেয় ২১০টি দল। স্বাগতিক হিসেবে কাতার বাছাইপর্ব না খেলেই সরাসরি খেলার সুযোগ পায়।

এবারের বিশ্বকাপে ৩২ টি দল প্রতি গ্রুপে ৪ টি করে মোট ৮ টি গ্রুপে লড়াই করবে। প্রতি গ্রুপ থেকে সেরা দুই দল অংশগ্রহণ করবে দ্বিতীয় পর্বে। এ পর্বে মোট ১৬ টি দল খেলবে। এই ১৬ দলের ৮ ম্যাচে জয়ী ৮ দল খেলবে কোয়ার্টার ফাইনাল। কোয়ার্টার ফাইনালের চার ম্যাচে জয়ী চার দল নিয়ে অনুষ্ঠিত হবে সেমিফাইনাল। সেমিফাইনালের দুই ম্যাচে জয়ী দল খেল্বে ফাইনাল ও পরাজিত দুই দল খেলবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ।

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর সময়সূচি

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর প্রাথমিক ফিক্সচার বা সময়সূচি প্রকাশিত হলেও কোন দলের খেলা কবে বা কোন গ্রুপে কারা খেলবে সেই তথ্য এখনো প্রকাশিত হয় নি। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে চূড়ান্ত ড্র এর মাধ্যমে জানা যাবে কোন দল কার বিপক্ষে কবে খেলবে।

বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২২ এর প্রথম ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ২১ নভেম্বর ২০২২ তারিখে। ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে আল বাইত স্টেডিয়ামে। ফাইনাল ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হবে ১৮ ডিসেম্বর ২০২২ তারিখে, লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে।

আয়োজক হিসেবে কাতার

কাতার যে ২০২২ বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করবে তা ২০১০ সালেই নির্ধারিত হয়। তখন পাঁচটি ভেন্যু বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য প্রস্তাবিত হয়। পরবর্তীতে আরো কিছু ভেন্যু এ তালিকায় যুক্ত হলেও ধারণা করা হচ্ছে মোট আটটি ভেন্যুতে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হবে। এই আটটি ভেন্যু খুবই দৃষ্টিনন্দন ও ব্যতিক্রমী স্থাপত্যশৈলী অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে। ভেন্যুগুলো হচ্ছে- লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়াম, আল বাইত স্টেডিয়াম, রাস আবু আবুদ স্টেডিয়াম, আল সুমামাহ স্টেডিয়াম, এডুকেশন সিটি স্টেডিয়াম, আহমেদ বিন আলী স্টেডিয়াম, খলিফা আন্তর্জাতিক স্টেডিয়াম এবং আল জানুব স্টেডিয়াম। এর মধ্যে দর্শক ধারণক্ষমতার বিবেচনায় লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামটি সবচেয়ে বড় এবং এর ধারণক্ষমতা ৮০,০০০ দর্শক।

কাতার আরব্য দেশ হওয়ায় সূর্যের তাপ অনেক বেশি হবে, যা খেলোয়াড়দের জন্য অসহনীয় পর্যায়ে চলে যাবে। এই তীব্র গরমকে মোকাবেলা করার জন্য ব্যবহৃত হবে শীতলীকরণ প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কমিয়ে আনা সম্ভব হবে।

যদিও বাংলাদেশ এ পর্যন্ত একবারও বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে নি, তবুও বাংলাদেশে ফুটবলের জনপ্রিয়তার কমতি নেই কোনো অংশেই। বিশ্বকাপ ফুটবলই না শুধু, ক্লাব ফুটবল খেলা কিংবা আঞ্চলিক খেলা, সবগুলোই জনপ্রিয়। বিশ্বকাপের সময় চলে এলে যেন এই জনপ্রিয়তা আরো শতগুণ বেড়ে যায়। চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা অফিস আওয়ারেও- পুরো মাস ব্যাপী একই গসিপ- বিশ্বকাপ ফুটবল! বিশ্বব্যাপী সম্প্রীতি তৈরির লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল বিশ্বকাপের, তারই ধারাবাহিকতা বজায় থাকুক সর্বত্র!

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button