তারাবির নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া -২০২৪

তারাবির নামাজের নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া -২০২৪ সম্পর্কিত লেখায় আপনাকে স্বাগতম। রমজান মাসে এশার নামাজের পর বিতরের পূর্বে যে সুন্নত নামাজ পড়া হয় সেটাকেই তারাবিহ বলে। এটাকে সালাতুল লাইলও বলা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নামাজ আদায় করেছেন। তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

এই লেখাটি পড়ে আপনি জানতে পারবেন- তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম, তারাবির নামাজের নিয়ত ও দোয়া, তারাবি নামাজের ফজিলত, তারাবির নামাজ কত রাকাত, খতম তারাবীহ ও সূরা তারাবীহ কি, তারাবিহ শেষে মুনাজাত, তারাবির নামাজ ২০ রাকাতের দলিল সম্পর্কে বিস্তারিত।

তারাবির নামাজের নিয়ম | তারাবি নামাজের ফজিলত

আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় তারাবিহর সালাতে দাঁড়াবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের সময়সূচি দেখতে- আজকের নামাজের সময়সূচী পড়ুন।
তারাবির নামাজের নিয়ম
তারাবির নামাজের নিয়ম

তারাবির নামাজের নিয়ত

আরবি: نويت ان اصلى لله تعالى ركعتى صلوة التراويح سنة رسول الله تعالى متوجها الى جهة الكعبة الشريفة الله اكبر.

উচ্চারণ: নাওয়াইতু আন উসালি­য়া ল্লিলাহি তাআ’লা, রাকাআ’তাই সালাতিত তারাবিহ সুন্নাতু রাসুল্লিলাহি তাআ’লা। মুতাওয়াযজ্জিহান ইলা যিহাতিল কা’বাতিশ শারিফাতি, আল্লাহু আকবার।

এছাড়া তারাবির নামাজ যদি জামাআ’তের সঙ্গে আদায় হয় তবে বলতে হবে- ‘ইক্বতাদাইতু বি হাজাল ইমাম’।

তারাবির নামাজের নিয়ত

তারাবি নামাজের চার রাকাত পরপর দোয়া

আমাদের দেশে তারাবির নামাজের চার রাকাত পর পর একটু বিশ্রাম নেওয়া হয়। সেই সময়টাতে একটি দোয়া পাঠ করা হয়।

আরবি: سبحان ذى الملك والملكوت سبحان ذى العزة والعظمة والهيبة والقدرة والكبرياء والجبروت . سبحان الملك الحى الذى لاينام ولا يموت ابدا ابدا سبوح قدوس ربنا ورب الملئكة والروح.

উচ্চারণ: ‘সুব্হানাযিল মুলকি ওয়াল মালাকুতি, সুব্হানাযিল ইয্যাতি, ওয়াল আয্মাতি, ওয়াল হাইবাতি, ওয়াল কুদরাতি, ওয়াল কিবরিয়াই, ওয়াল যাবারুত। সুব্হানাল মালিকিল হাইয়্যিল্লাজি লা-ইয়াানামু ওয়ালা ইয়ামুতু আবাদান আবাদা। সুব্বুহুন কুদ্দুছুন রাব্বুনা ওয়া রাব্বুল মালাইকাতি ওয়ার রূহ।’

তারাবির নামাজ কত রাকাত | তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে বিশ রাকাত তারাবি তিন রাকাত বিতির পড়তেন। (বায়হাকি, আস সুনানুল কুবরা: ৪৭৯৯)

তবে আরো অন্যান্য হাদিসে তারাবির নামাজ বহু সংখ্যায় উল্লেখ আছে। তবে আমরা উমর রাঃ আদেশ অনুযায়ী আমল করব। তিনি ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়ার কথা বলেছেন। সাহাবীদের সুন্নত অনুসরণ করাও ইসলামের আইন।

তারাবির নামাজ সুন্নাত না নফল

চার মাযহাবের ইমামদের মতে এটা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ নামাজ রমজান মাসে এশার নামাজের সময় পড়তে হয়। প্রয়োজনে দেখতে পারেন-  রমজানের সময়সূচী ও রোজার ক্যালেন্ডার ডাউনলোড করুন।

খতম তারাবীহ এবং সূরা তারাবীহ কী?

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান মাসে অধিক পরিমাণে কুরআন তেলাওয়াত করতেন। সাহাবীরা তারাবির নামাজে পুরো কুরআন শরীফ তেলাওয়াত করতেন। কেউ সাত দিনে, কেউ বা তার চেয়ে একটু বেশি সময় নিয়ে। তবে ২৭ দিনে পূর্ণ কুরআন তেলাওয়াত তারাবির নামাজে খতম করা হয়। তাই সেটাকে খতমে তারাবিহ বলে। এছাড়া ছোট ছোট সূরা দিয়ে যে তারাবির নামাজ আদায় করা হয় তাকে সূরা তারাবি বলে।

তারাবিহ নামাজের দোয়া ও মুনাজাত | তারাবির নামাজের নিয়ম

নামাজের পর আমরা হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করি। দোয়া মানে হল নিজের মনের আকুতি আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করা। নিজের চাহিদা আল্লাহর কাছে বলা। অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হওয়া এবং হওয়া প্রার্থনা করা।

আরবি: اَللَهُمَّ اِنَّا نَسْئَالُكَ الْجَنَّةَ وَ نَعُوْذُبِكَ مِنَ النَّارِ يَا خَالِقَ الْجَنَّةَ وَالنَّارِ- بِرَحْمَتِكَ يَاعَزِيْزُ يَا غَفَّارُ يَا كَرِيْمُ يَا سَتَّارُ يَا رَحِيْمُ يَاجَبَّارُ يَاخَالِقُ يَابَارُّ – اَللَّهُمَّ اَجِرْنَا مِنَ النَّارِ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ يَا مُجِيْرُ- بِرَحْمَتِكَ يَا اَرْحَمَ الرَّحِمِيْنَ

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্না নাসআলুকাল জান্নাতা ওয়া নাউজুবিকা মিনাননার। ইয়া খালিক্বাল জান্নাতি ওয়ান নার। বিরাহমাতিকা ইয়া আঝিঝু ইয়া গাফফার, ইয়া কারিমু ইয়া সাত্তার, ইয়া রাহিমু ইয়া ঝাব্বার, ইয়া খালিকু ইয়া বার্রু। আল্লাহুম্মা আঝিরনা মিনান নার। ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝিরু, ইয়া মুঝির। বিরাহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমিন।

তারাবির নামাজ ২০ রাকাতের দলিল | তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করার দলিল

কুতায়বা (রহঃ) বলেন, আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক রাত্র মসজিদে তারাবিহর সালাত আদায় করলেন, তার সঙ্গে শরীক হয়ে কিছু সংখ্যক লোক সালাত আদায় করল। তারপর পরবর্তী রাত্রেও তারাবীইহর সালাত আদায় করলে লোকের সংখ্যা বেড়ে গেল। তারপর তারা তৃতীয় রাত্রেও অথবা চতুর্থ রাত্রেও তারাবিহর সালাত আদায় করার জন্য জড়ো হয়ে গেলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আর তাদের সামনে বের হলেন না। সকাল হলে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা যা করেছিলে আমি তা দেখছিলাম। তোমাদের উপর তারাবীহর সালাত ফরয হয়ে যাওয়ার আশংকা ব্যাতীত অন্য কোনো কারনে তোমাদের সামনে বের হওয়া থেকে আমাকে বিরত রাখেনি। এ ঘটনা রমযান মাসে ঘটেছিল।

[সহীহ। সালাতুত তারাবীহ (১২-১৪), সহীহ আবু দাউদ হাঃ ১২৪৩, বুখারী ১১২৯, মুসলিম (ইসলামিক সেন্টার) হাঃ ১৬৬০]

>>> এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তারাবিহর নামাজ পড়েছেন এবং জামাতে আদায় করেছেন।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে বিশ রাকাত তারাবি তিন রাকাত বিতির পড়তেন। (বায়হাকি, আস সুনানুল কুবরা: ৪৭৯৯)

>>> এখান থেকে প্রমাণিত হয় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ২০ রাকাআত তারাবিহ পড়েছেন।

আবদুল্লাহ ইবনু ইউসুফ (রহঃ) বলেন, আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াব লাভের আশায় তারাবীহর সালাতে দাঁড়াবে তার পূর্ববর্তী গোনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে। হাদীসের রাবী ইবনু শিহাব (রহঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইন্তেকাল করেন এবং তারাবীহর ব্যাপারটি এ ভাবেই চালু ছিল। এমনকি আবূ বকর (রাঃ) এর খিলাফতকালে ও ’উমর (রাঃ) এর খিলাফতের প্রথম ভাগে এরূপই ছিল।

>>> এই হাদিস থেকে জানতে পারি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম এর ওফাতের পর দ্বিতীয় খলিফার প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নভাবে লোকেরা তারাবির নামাজ আদায় করত।

জামায়াতে তারাবিহর নামাজ পড়ার দলিল

১.
ইবনু শিহাব (রহঃ) ’উরওয়া ইবনু যুবায়র (রহঃ) সূত্রে ’আবদুর রাহমান ইবনু ’আবদ আল ক্বারী (রহঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি রমযানের এক রাতে ’উমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) এর সঙ্গে মসজিদে নববীতে গিয়ে দেখতে পাই যে, লোকেরা বিক্ষিপ্ত জামায়াতে বিভক্ত। কেউ একাকী সালাত (নামায/নামাজ) আদায় করছে আবার কোনো ব্যাক্তি সালাত আদায় করছে এবং তার ইকতেদা করে একদল লোক সালাত আদায় করছে। ’উমর (রাঃ) বললেন, আমি মনে করি যে, এই লোকদের যদি আমি একজন ক্বারীর (ইমামের) পিছনে একত্রিত করে দেই, তবে তা উত্তম হবে।
এরপর তিনি উবাই ইবনু কা’ব (রাঃ) এর পিছনে সকলকে একত্রিত করে দিলেন। পরে আর এক রাতে আমি তাঁর [উমর (রাঃ)] সঙ্গে বের হই। তখন লোকেরা তাদের ইমামের সাথে সালাত আদায় করছিল। উমর (রাঃ) বললেন, কত না সুন্দর এই নতুন ব্যবস্থা! তোমরা রাতের যে অংশে ঘুমিয়ে থাক তা রাতের ঐ অংশ অপেক্ষা উত্তম যে অংশে তোমরা সালাত (নামায/নামাজ) আদায় কর, এর দ্বারা তিনি শেষ রাত বুঝিয়েছেন, কেননা তখন রাতের প্রথমভাগে লোকেরা সালাত আদায় করত।

২.
প্রখ্যাত তাবেয়ি হযরত আ. রহমান আলকারী র. বলেন, আমি রমজান মাসে হযরত উমরের সাথে মসজিদে গেলাম। দেখলাম, লোকেরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে তারাবি পড়ছে। হযরত উমর বলেন, সকলকে এক ইমামের পেছনে জামাতবদ্ধ করে দিলে মনে হচ্ছে উত্তম হয়।

হযরত উমর রা. কুরআনের ক্বারী হযরত উবাই ইবনে কাব এর ইমামতিতে সকলকে জামাতবদ্ধ করে দিলেন। (মুয়াত্তা মালেক)

ইয়াযিদ ইবনে রুমানসহ একাধিক বর্ণনাকারি হযরত উমরের যুগে বিশ রাকাত তারাবি জামাতবদ্ধভাবে হওয়ার বর্ণনা করেন।

>>> এখান থেকে প্রমাণিত হয় যে উমর রাঃ তার খেলাফত কালে তারাবির নামাজ জামাতে আদায় করার আদেশ প্রদান করেন। অনেকে হয়তো ওনার এই কার্যক্রমকে বিদআত বলতে পারেন। কিন্তু বাস্তবে এটা বিদআত নয়। কেননা রাসুলুল্লাহ সাঃ জামাতে তারাবির নামাজ আদায় করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জামাতে তারাবির নামাজ পড়া ত্যাগ করেছিলেন কারণ তিঁনি আশঙ্কা করেছিলেন এটা হয়তো আল্লাহতালা উম্মতের উপর ফরজ করে দেবে। উম্মতের কষ্ট হবে বিধায় তিনি জামাতে তারাবির নামাজ আদায় করা পরিত্যাগ করেন।

দ্বিতীয় খলিফা উমর রাঃ আবারো সেই নবীজির সা. আমলের প্রথা পুনরায় প্রচলন করেন। কেননা নবীজির সা. ওফাতের পর কোন অহি নাযিল হবে না এবং কোনো আমল ফরজ হওয়ারও আশঙ্কা থাকবে না।

আশা করছি, তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম, নিয়ত ও দোয়া সম্পর্কিত লেখাটি পড়ে আপনি জানতে পেরেছেন কিভাবে তারাবির নামাজ পড়তে হয়। তাছাড়া আরও জানতে পারছেন, তারাবির নামাজের ফজিলত সম্পর্কেও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top