ফুল বাগানের শোভা ও ঔষধি গুণে ভরপুর অপরাজিতা ফুল

ফুল প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ দান। পৃথিবীতে রয়েছে কত রঙের, কত আকৃতির, কত রকমের সৌরভ সম্বলিত ফুল। ফুলের সৌন্দের্য্যে আর বাহারি রঙ আর মুগ্ধ মনকে করে প্রফুল্ল। আজকে আলোচনা করব অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা ও পরিচিতি সম্পর্কে। মনের প্রফুল্লতা বজায় রাখতে মানুষ লাল, নীল, হলুদ, সাদা কত রকমের ফুল চাষ করে থাকেন।

তার মধ্যে নীল রঙের নজর কাড়া একটি ফুল অপরাজিতা। এই ফুলের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। ফুলটির নানা ধরনের নামও রয়েছে। অপরাজিতা ফুলটির রয়েছে নানা ঔষধি গুণ ও উপকারিতা। আমরা এই অপরাজিতা ফুলের ঔষধি গুণ ও উপকারিতা সম্পর্কে জানব।

অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা

পরিচিতি: প্রতিটি ফুল কোন না কোন গোত্রের অন্তর্গত। অপরাজিতা ফুলটিও Popilionacae পরিবারের অন্তর্ভূক্ত। অপরাজিতা ফুল এর ইংরেজি নাম বাটারফ্লাই পি। ফুলটিরে রং গাঢ় নীল তাই একে নীলকন্ঠ ফুল নামে চিনেন অনেকে। অপরাজিতা ফুলটির আগমন ঘটে মালাক্কা দ্বীপ থেকে। মালাক্কা দ্বীপ বা টারনেট থেকে এসেছে তাই এই অপরাজিতা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম ক্লিটোরিয়া টারনেটিকা। ক্লিটোরিয়ার বাংলা অর্থ করলে দাড়ায় যোনিপুষ্প। এই ফুলের আকৃতির জন্য এর নাম যোনিপুষ্প বলেও ডাকা হয়। ভারতের কেরালায় অপরাজিতা ফুলের নাম শঙ্খপুষ্পী।

আরো পড়ুন

প্রকারেভেদ: নীল রঙ ছাড়াও অপরাজিতা ফুল সাদা, হালকা বেগুনী, হলুদ ও লাল রঙেরও হয়ে থাকে।

সাদা অপরাজিতা ফুলের ছবিসাদা অপরাজিতা ফুলের ছবি

অপরাজিতা ফুলের বৈশিষ্ট্য

অপরাজিতা ফুলের গাছটি লতানো এবং সবুজ পাতা বিশিষ্ট। পাতার গঠন উপবৃত্তাকার। পুর্ণাঙ্গ একটি ফুল গাছ ঝোপের মত হয়ে যায় এবং প্রায় সারা বছর ফুল ফুটে। দীর্ঘজীবী এ গাছটি প্রায় ২০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। ঔষধি গুন বিশিষ্ট এ ফুলটি ছাদ বাগান বা স্বাভাবিক বাগানে নানা বাহারি ফুল মনোমুদ্ধকর পরিবেশ তৈরি করে। সুন্দর রং ও গঠনে নজর কাড়ে এই অপরাজিতা ফুল।অপরাজিতা ফুলের বৈশিষ্ট্য

চাষ পদ্ধতি: বর্ষা মৌসুমে অপরাজিতা ফুল গাছের ডাল মাটিতে রোপণ করে রাখতে হয়। এ ফুলের বিচি সাধারণত ছোট ছোট ধূসর ও কালো বর্ণের হয়ে থাকে। এই বিচি রোদে শুকিয়ে নরম মাটিতে রোপণ করতে হয়।

টবে অপরাজিতা ফুল চাষের জন্য যা যা প্রয়োজন তা নিচে তুলে ধরা হল-
টব- অপরাজিতা ফুল চাষ করার জন্য প্রয়োজন বড় আকারের একটি টব।
মাটি- অপরাজিতা ফুল গাছের সবচেয়ে ভালো চাষ হয় দোঁআশ মাটিতে।
সার- এ ফুল চাষে গোবর সারের কোন জুড়ি নেই।

কিভাবে সার মাটি তৈরী করবেন– প্রথমে ৫-৬ কেজি বাগান নিন। তারপর গোবর সার ৩ কেজি ও স্টেরামিল ৩০০ গ্রাম মাটির সাথে ভালো করে মিশিয়ে টবে ফেলুন। তারপর টবে অপরাজিতা ফুলের বীজ থেকে চারা জন্মাবে। শুরুতে টবে একটা লাঠি দাঁড় করিয়ে দিন। যাতে অপরাজিতা গাছটি শুরুতেই একটা অবলম্বন পায়। কিছু বেড়ে উঠার পর দেওয়াল বা রেলিং হলেই ভালো হবে।

অপরাজিতা ফুলের বীজ প্রাপ্তিস্থান: বাংদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেন, শিশু একাডেমির বাগান, রমনা পার্ক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল, বলধ গার্ডেন ও অনেক অফিসের বাগানেও অপরাজিতা ফুলের গাছ রয়েছে।

অপরাজিতা ফুল কখন ফোটে: অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা যেমন রয়েছে, তেমনি বয়স কম হলেও ৫ কোটি বছর। সারা বছরই নীল অপরাজিতা ফুল ফোটে। নীল অপরাজিতার শাখা প্রশাখা অল্প সময়ে ছড়ায় সে তুলনায় সাদা অপরাজিতা শাখা-প্রশাখা ছড়াতে দেরি হয়।

গুণাবলী: অপরাজিতা শুধুমাত্র সৌন্দর্যে সীমাবদ্ধ নয়, এ ফুল ঔষধি গুণেও ভরপুর ও অতুলনীয়। অপরাজিতা ফুল, পাপড়ি, মুল ও গাছের লতা বিভিন্ন রকম ভেষজ চিকিৎসায় বহুকাল থেকে ব্যবহৃত। অপরাজিতা ফুল হিন্দু ধর্মালম্বীদের নিকট পবিত্র উদ্ভিদ হিসেবে পরিচিত। তাছাড়া শারদীয় দূর্গোৎসবে ষষ্ঠীতে এবং বিজয়া দশমীর পূজায় এ অপরাজিতার ব্যবহার করতে দেখা যায়।

অপরাজিতা ফুলের ঔষধি গুন

এতে অধিক মাত্রায় ফাইটোনিউট্রিয়েন্টস রয়েছে। যার ফলে এর ঔষুধি গুণাবলীও অনেক। এবার অপরাজিতা ফুলের ঔষধি গুন সম্পর্কে জেনে নেয়া যাক-

  • লিভার সুরক্ষা: অপরাজিতার নীল চা পলিফেনল ও ফ্লাভোনোয়েড যৌগ লিভার এনজাইমের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে লিভারের সুরক্ষায় অসাধারণ ভূমিকা পালন করে অপরাজিতার ফুলের চা।
  • ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: অপরাজিতা রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে। যার ফলে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে কাজ করে।
  • অ্যাজমা প্রতিরোধ: অপরাজিতায় বিদ্যমান স্যাপোনিন ও ফ্লাভোনোয়িড যৌগ অ্যাজমা প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।
  • ক্যান্সার প্রতিরোধ: অপরাজিতায় রয়েছে অ্যান্থোসায়ানিন, যার ফলে মানব দেহে ফ্রি রেডিক্যাল তৈরিতে বাধা দেয়। যা কিনা ক্যান্সার প্রতিরোদে সাহায্য করে।
  • স্মৃতিশক্তি বাড়াতে অপরাজিতা: এটি অ্যালঝেইমার রোগের চিকিৎসার ব্যবহুত হয়, যা স্মৃতিশক্তিবর্ধক হিসেবে কাজ করে।
  • হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: এটি রক্তের ট্রাইগ্লিসারাইডস, কোলেস্টেরল ও এলডিএলের কমানোর মাধ্যমে হৃদরোগের ঝুঁকিতে সহায়তা করে থাকে।

শরীরের জন্য উপকারী অপরাজিতা ফুলের চা
‘অপরাজিতা ফুলের চা’- কথাটি শুনার পরই অবাক হয়ে গেলেন? আসেলেই এটি শোনার পর অবাক হবারই কথা। মূলত অপরাজিতার চা সম্পর্কে আমাদের ধারণা নেই। অপরাজিতা ফুলের ঔষধি গুন অনেক, তাই এ চা সম্পর্কে ধারণা দেয়াটাই জরুরী। তাই নিচে চা সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো-অপরাজিতা ফুলের চা

  • অপরাজিতা ফুলের চা পরিচিতি: নীল চা বা ব্লু টি নামে পরিচিত এ ফুলের চা। এটি সম্পূর্ণ ক্যাফেইনমুক্ত হারবাল চা। হারবাল চা বলার কারণ- এটি উদ্ভিদ থেকে তৈরি হয় তাই এটিকে হারবাল চা বলা হয়।
  • চা তৈরির পদ্ধতি: ইনফিউশন বা ডিকোটেশন পদ্ধতিতে নীল চা তৈরি করা হয়। এ পদ্ধতিতে ফুলেল পাপড়ি বা সম্পূর্ণ গাছ পানিতে ডুবিয়ে নির্যাস বের করে সংরক্ষিত করা হয়। এর মজার বিষয় হলো- অম্লত্ব ও ক্ষারত্বের উপর ভিত্তি করে রং বদলায়। লেবুর রস যোগ করলে বেগুনি রং ধারণ করবে।
  • উপাদান: এ চা সাধারণত ঠান্ডা বা গরম অবস্থায় পরিবেশন করা হয়। এতে প্রচুর পরিমাণে ফাইটোকেমিক্যালস রয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো- পলিফেনল, ফ্লাভোনোয়িডস, স্যাপোনিন, ট্যানিন, অ্যান্থোসায়ানিন, অ্যালকালোয়িডস, টারনাটিনস, ইনোসিটল ও পেন্টান্যাল ইত্যাদি। এত গুণ যে চায়ে রয়েছে সে চা পান করে দেখতেই পারেন একবার।

শেষ কথা- অপরাজিতা ফুলের উপকারিতা- চঞ্চলতা ও হতাশা কাটানোর এক দারুণ ওষুধ হতে পারে এই নীল-চা।

Show More

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button