খেজুরের উপকারিতা ও খেজুর খাওয়ার সঠিক নিয়ম

খেজুরের উপকারিতা ও খেজুর খাওয়ার সঠিক নিয়ম

খেজুর খেতে আমরা কে-না ভালোবাসি। বিশেষ করে রমজান মাসে তো খেজুর ছাড়া ইফতার ও সেহরি অপূর্ণই মনে হয়। এমনটি মনে হবে-না-ইবা কেনো? এটি যে দারুন সুস্বাদু ফল এবং অসংখ্য পুষ্টি উপাদানের সমৃদ্ধ ভান্ডার। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -নিজেও খেজুর খেতে পছন্দ করতেন। 

খেজুরের যে বহু উপকারিতা রয়েছে তা আমরা সকলেই কম-বেশি জানি। তবে আমাদের দেহে এর কি কি উপকারিতা রয়েছে এবং কখন ও কিভাবে খেজুর খেলে সবচেয়ে বেশি উপকারিতা পাওয়া সম্ভব, সে সম্পর্কে জানেন না অনেকেই। তাই খেজুরের উপকারিতা ও খেজুর খাওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য থাকছে আজকের এই আলোচনায়। সে সম্পর্কে জানতে আর্টিকেলটি শেষ পর্যন্ত পড়তে থাকুন।

খেজুরের উপকারিতা সম্পর্কে জানার আগে, এর পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে জানাও জরুরী। গবেষণা অনুযায়ী জানা যায়, আমাদের দেহের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান গুলোর প্রায় অধিকাংশই বিদ্যমান রয়েছে খেজুরে। যেমন:

  • খেজুরে আছে প্রচুর পরিমাণে ক্যালোরি,
  • শর্করা,
  • প্রোটিন,
  • ভিটামিন এ, বি, ভিটামিন বি-6 ও ভিটামিন কে,
  • এছাড়াও ফাইবার,
  • আয়রন,
  • ফ্রুকটোজ,
  • গ্লাইসেমিক,
  • লিউটেন,
  • জিক্সাথিন,
  • ভেষজ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ‘পলিফেনল’,
  • এমনকি পাকা খেজুরগুলোতে প্রায় ৮০% চিনিজাতীয় উপাদান থাকে।

আরও আছে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, সালফার, কপার, আয়রন ও জিঙ্কের মতো প্রায় ১৫ টি খনিজ উপাদান। 

খেজুরে স্যাচুরেইটেড ফ্যাট ও ট্র্যান্স ফ্যাট নেই। তাই এটি স্বাস্থ্যের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়।

চলুন এবার খেজুরের উপকারিতা গুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক:

খেজুরের উপকারিতা | খেজুর খাওয়ার উপকারিতা

পুষ্টিবিদদের মতে খেজুরের উল্লেখযোগ্য উপকারিতা গুলো হলো:

  • মানবদেহের জন্য খেজুর হলো শক্তির আধার।  খেজুরের কার্বোহাইড্রেট খুবই দ্রুত শক্তি যোগায় এবং দুর্বলতা কমিয়ে দেহকে সক্রিয় রাখে। যেকোনো বয়সের মানুষ প্রতিদিন ৩-৫ টি খেজুর খেলে, সকল প্রকার অবসাদ ও ক্লান্তি দূরে থাকবে।
  • খেজুরের পুষ্টি উপাদান গুলো আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, এর এন্টিঅক্সিডেন্ট গুলো রোগাক্রান্ত দেহে এন্টিবডি গঠন করতেও সহায়তা করে। এটি যকৃতের সমস্যা, হৃদরোগ, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, যৌনরোগ, গনোরিয়া, শ্বাসকষ্ট, পেটের গ্যাস, জ্বর, সর্দি ইত্যাদি থেকে আমাদের রক্ষা করে।
  • খেজুরে থাকা প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়ামস, ম্যাঙ্গানিজ, ফসফরাস, পটাশিয়াম ইত্যাদি উপাদানগুলো আমাদের পেশি ও হাড় মজবুত করতে সহায়তা করে।
  • খেজুর আমাদের দাঁতের মাড়িকে সুরক্ষিত ও মজবুত রাখে। 
  • খেজুর আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধি করে। নিয়মিত খেজুর খেলে মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, এবং স্মৃতিশক্তি হ্রাসজনিত সমস্যা দূর হয়।
  • খেজুরে থাকা আয়রন আমাদের রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ায়। তাছাড়া খেজুরে থাকা কপার আমাদের দেহে লোহিত রক্তকণিকা গঠনেও সাহায্য করে।
  • খেজুরে অধিক মাত্রায় পটাশিয়াম থাকে, যা হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় এবং যারা ইতিমধ্যেই হৃদরোগে আক্রান্ত তাদের স্ট্রোকের ঝুঁকিও কমায়।
  • খেজুর আমাদের দেহের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা LDL কমায় এবং উপকারী কোলেস্টেরল বা HDL বৃদ্ধি করে। এটি হৃদস্পন্দনের হার ঠিক রাখে এবং এতে থাকা ম্যাগনেসিয়াম উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে।
  • খেজুরে থাকা ‘ভিটামিন-এ’ আমাদের চোখের দৃষ্টিশক্তি বাড়ায় এবং রাতকানা রোগের ঝুঁকি কমায়। এছাড়াও খেজুরে লিউটেন ও জিক্সাথিন থাকায়, তা রেটিনা ভালো রাখে।
  • গর্ভাবস্থায় খাওয়ার উপযোগী একটি আদর্শ ফল হলো খেজুর। কারণ, এটি পুষ্টিগুণ, খনিজ পদার্থ এবং ভিটামিন সমৃদ্ধ। গর্ভবতী নারীরা নিয়মিত খেজুর খেলে মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে।
  • অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা, সন্তান জন্মদানের পূর্ববর্তী দিনগুলোতে, নিয়মিত আজওয়া খেজুর খেলে, জরায়ুর মাংসপেশির দ্রুত সংকোচন ও প্রসারণ ঘটবে। এটি সুস্থভাবে প্রসব হতে সহায়ক।
  • খেজুর নারী-পুরুষ উভয়েরই যৌনস্বাস্থ্য ভালো রাখে। নিয়মিত খেজুর খেলে পুরুষের শুক্রাণুর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এটি অকাল বীর্যপাত রোধ করতে কার্যকরী। অন্যদিকে, নারীদের ক্ষেত্রে যৌন ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গর্ভধারণ ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে এই খেজুর।
  • খেজুরে থাকা ফাইবার আমাদেরকে কোষ্ঠকাঠিন্য ও বদহজমজনিত সমস্যা থেকে রক্ষা করে। এতে থাকা এন্টিঅক্সিডেন্ট গুলো অন্ত্রের কৃমি ও ক্ষতিকারক পরজীবী প্রতিরোধ করে। পাশাপাশি পরিপাকতন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া উৎপাদনেও সহায়তা করে।
  • ওজন কমাতে এবং ওজন বাড়াতে উভয় ক্ষেত্রেই খেজুর বেশ উপকারী। একদিকে খেজুরে থাকা উপাদানগুলো আমাদের দেহের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে ও পেশি গঠনে সহায়তা করে। অন্যদিকে, খেজুরে থাকা ফাইবার ক্ষুধা হ্রাস করে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়া এড়িয়ে ওজন কমানো যায়। 
  • খেজুর আমাদের ত্বককে টানটান করে, ত্বকের দাগ, শুষ্কতা ও বলিরেখা দূর করে। তাছাড়া এটি আমাদের চুলের গোড়া মজবুত করা ও চুলের উজ্জ্বলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আমাদের দৈহিক সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে।

এরকমই আরো অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে খেজুরের, যা একটি আর্টিকেলে উপস্থাপন করে শেষ করা সম্ভব নয়। চলুন এবার জেনে নেওয়া যাক- কিভাবে খেজুর খেলে আমরা সবচেয়ে বেশি উপকারিতা পেতে পারি:

খেজুর খাওয়ার নিয়ম ও খেজুর খাওয়ার সেরা সময় কখন

যেকোনোভাবে খেজুর খেলেই আমাদের দেহে তার উপকারিতা পাবো। তবে কিছু উল্লেখযোগ্য নিয়মে খেজুর খেলে তা বাড়তি উপকারিতা বয়ে আনে। যেমন: 

  • সকালে খালি পেটে ভেজানো খেজুর খাওয়া।
  • দুপুরের খাবারের আগে খেজুর খাওয়া।
  • রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে খেজুর খাওয়া।
  • ব্যায়াম করার ৩০ মিনিট আগে খেজুর খাওয়া।
  • এছাড়াও মিষ্টি জাতীয় খাদ্য খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করলেই, আপনি যেকোনো সময় খেজুর খেতে পারেন।
  • যারা দুধ খেতে পছন্দ করেন, তারা দুধের সাথে বীজ ছাড়ানো খেজুর নিয়ে, ৫-৬ মিনিট ভালোভাবে গরম করে, ফুটিয়ে খেতে পারেন। 

আরও পড়ুন: শরীর সুস্থ রাখতে স্বাস্থ্যকর খাবার খাবেন

তবে খেজুর খুব বেশি মাত্রায় খেলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং শরীরের ওজন বৃদ্ধি, বদহজম ইত্যাদি সমস্যা হতে পারে। তাই নিয়মিত ৪-৫ টি খেজুর খেতে পারেন।

পবিত্র মাহে রমজানে আপনারা নিজে খেজুর খাওয়ার পাশাপাশি অন্যদেরকেও এই পুষ্টিকর খাবারটি খাওয়াতে পারেন। 

খেজুরের উপকারিতা ও খেজুর খাওয়ার সঠিক নিয়ম সম্পর্কে এই ছিল আমাদের আজকের আলোচনা। ঈন-শা-আল্লাহ, নতুন কোন উপকারী তথ্য নিয়ে আবার হাজীর হবো আপনাদের সামনে। সে পর্যন্ত সকলেই ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন, ধন্যবাদ।

1 thought on “খেজুরের উপকারিতা ও খেজুর খাওয়ার সঠিক নিয়ম”

  1. খেজুরে উপকার আছে এটা আসলেই সত্য কিন্তু বাংলাদেশে যেভাবে খেজুরের দাম বাড়তিছে তাতে আমজনতার জন্য খেজুর কিনে খাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে অনেকের জন্য। সরকার খেজুরের উপর ট্যাক্স বাদ দিলে দামও হাতের নাগালে পাওয়া যেতো হইতো।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top