ডালিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা

ডালিম আমাদের খুবই পরিচিত একটি ফল। গ্রামাঞ্চলে অনেকে বাড়ির আঙিনায় এই ফল গাছ রোপন করে। গাছের পাতাগুলো চিকন চিকন এবং গাছটা কিছুটা মেহেদী গাছের মতো। এই ফলের স্বাদ অনন্য। ঘ্রাণ মোহনীয়। এটাকে রাজা বাদশাহদের ফল বলা হয়। কেননা এটা এতটাই সুন্দর। এই ফলের দানাগুলো দেখতে হয় রক্তিম বর্ণের রুবির মতো। রুবি একটি অত্যন্ত দামি পাথর।

এই ফলের যেমন রয়েছে স্বাদ ও গন্ধ— তেমনি রয়েছে এর অসংখ্য গুণ। এই গুণী ফলটির গুণ আপনাদের সামনে উপস্থাপন করার জন্য আমাদের এই ‘ডালিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা’ নামক প্রবন্ধটি। এটা পাঠ করে আপনি জানতে পারবেন ডালিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা। তাই সম্পূর্ণ পাঠ করার জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে।

নামকরণে ডালিম

গ্রামবাংলায় শিশু বাচ্চাদের রূপকথার গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আছে যারা রূপকথার গল্প শোনেনি। রূপকথার গল্প শুনে থাকলে অবশ্যই ডালিম কুমার নামটি শুনেছে নিশ্চয়। একজন রাজকুমারের নাম কেন ডালিম? নিশ্চয় এর পেছনে কোনো কারণ আছে। এর কারণটি হলো ডালিমের আভিজাত্য। এই ফল বিশ্বের অন্যান্য ফলের চাইতে ভিন্ন। এই ফল কিছুটা শক্ত ও দানাদার। তবে এতটাও শক্ত নয় যে এটাকে খেতে বেগ পেতে হবে। এর স্বাদ, গুণ ও সৌন্দর্যে মানুষজন বিমোহিত হয়ে সন্তানের নাম রাখে ডালিম।

অনেক মানুষের নাম শুনে থাকবেন ‘রুমান’। জিজ্ঞাস করলে বলে এটা কুরআনে পেয়েছে। কিন্তু এটার অর্থ খুব কম মানুষই জানে। এই ‘রুমান’ শব্দের অর্থ ডালিম। এটা এতটাই সুস্বাদু যে— বেহেশতে ডালিম ফল থাকার কথা ধর্ম শাস্ত্রেও রয়েছে।

এছাড়া অনেক মানুষের নাম আনার রাখা হয়। তবে বেদানা নামটা আগেরটার সময় মেয়েদের নাম রাখা হতো। কেননা ব্যক্তিগত অনুসন্ধানে এটা নজরে পড়েছে। একটি ফল কতটা জনপ্রিয় হলে মানুষের নাম সেই ফলের নাম অনুসারে রাখা হয় আন্দাজ করুন।

ডালিম ফলের বিস্তৃতি

ডালিম ফলের আদি নিবাস ইরান এবং ইরাকে। ফারসি ও আরবি সাহিত্যে ডালিম ফলের অসংখ্য নিদর্শন রয়েছে। তপ্ত মরুভূমির মাঝে এক খণ্ড জমিতে ডালিমের বাগান— যা ছিল ওই অঞ্চলের মানুষজনের স্বপ্ন। এছাড়া ফারসি ও আরবি কবিগণ কোনো হৃদ বা জলাশয়ের উপমা দিতে গেলে বলতো— ‘ওই সরোবর জল যেন ডালিমের রস।’

ককেশাস অঞ্চলে ডালিম ফলের চাষ প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। সেখান থেকেই ডালিম ভারত উপমহাদেশে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। যা এখন বাংলাদেশের একটি অর্থকরী ফল। বাংলাদেশের উচিত বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ আরো বৃদ্ধি করা।

‘ডালিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা’ প্রবন্ধটি লেখার সময় জানা গেছে আফগানিস্তান ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে ডালিমের চাষ ঘটিয়ে একটি বিপ্লব এনেছে। এখন তারা পশ্চিমাদের সমূহে ডালিমের জুস রপ্তানি করে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে।

স্পেনীয়রা আঠার’শ শতকে ল্যাটিন আমেরিকা এবং ক্যালিফোর্নিয়াতে ডালিমের প্রসার ঘটায়। এর ফলে এখন ক্যালিফোর্নিয়া ও এরিজোনাতেও এর ব্যাপক চাষাবাদ হচ্ছে। উত্তর গোলার্ধে এটি সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে এর ফলন উত্তোলন করা হয়। দক্ষিণ গোলার্ধে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এটির ফল গাছে ধরে।

বর্তমানে ডালিম ফল তুরস্ক, ইরান, সিরিয়া, স্পেন, আজারবাইজান, আর্মেনিয়া, আফগানিস্তান, ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, ইরাক, লেবানন, মিশর, চীন, বার্মা, সৌদি আরব, ইসরাইল, জর্ডান, ফিলিপাইন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শুষ্ক অঞ্চল, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ ইউরোপ এবং ক্রান্তীয় আফ্রিকার দেশ সমূহে বিপুল পরিমাণে চাষ করা হচ্ছে।

ডালিম চাষ

ডালিম ফল চাষ করা অন্যান্য শস্য জাতীয় ফসল চাষ করা থেকে অনেক সহজ। সবার আগে ভালো যাতে ডালিমের চারা সংগ্রহ করতে হবে। বাংলাদেশের সাধারণত গ্রামাঞ্চলে যে সকল ডালিম গাছ থাকে সেগুলোতে ছোট ছোট ফল হয়। তাই উন্নত জাতের ডালিমের চারা রোপণ করতে হবে। ডালিম গাছ কতটুকু বড় করা হবে সেটা অনুমান করে একটি গাছের থেকে অন্য আরেকটি গাছের দূরত্ব নির্ধারণ করতে হবে। ডালিম গাছ দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মায়। সামান্য স্যার বিশেষ করে জৈব সার এর জন্য উত্তম। নিয়মিত গাছের গোড়ায় পানি দিতে হবে। তবে পানি জমিয়ে রাখা চলবে না। কেননা এই গাছ শুষ্ক আবহাওয়াতেও জন্মে।

ডালিম ফলে মাঝেমধ্যে পোকার আক্রমণ হয়। এছাড়া এর পাতায় ছত্রাক আক্রমণ করতে পারে। এর জন্য কৃষি অধিদপ্তর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন কীটনাশক ও ছত্রাকনাশক ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়ে থাকে। অবশ্যই কৃষি বিষয়ক অভিজ্ঞ অফিসার থেকে পরামর্শ নিয়েই কীটনাশক প্রয়োগ করতে হবে।

ডালিম ফলের পুষ্টিগুণ

ডালিম খুবই সুস্বাদু ও অনেক পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ একটি ফল। ফলটির প্রচুর পুষ্টিগুণ আছে।
এক কাপ ডালিম দানায় রয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের
•৩০ শতাংশ ভিটামিন সি
•৩৬ শতাংশ ভিটামিন কে
•১৬ শতাংশ ভিটামিন বি-9
•১২ শতাংশ পটাশিয়াম
এতে প্রচুর পরিমাণে আছে ফসফরাস— যা কমলা, আপেল ও আমের চাইতে চারগুণ।
আতা ও আঙ্গুরের চাইতে দ্বিগুণ।
বরই ও আনারসের চাইতে প্রায় সাতগুণ বেশি।

এর প্রতি ১০০ গ্রাম ডালিমে রয়েছে
•৭৮ শতাংশ পানি
•১.৫ ভাগ আমিষ
•০.১ ভাগ স্নেহ
•৫.১ ভাগ আঁশ
•১৪.৫ ভাগ শর্করা
•০.৭ ভাগ খনিজ
•১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম
•১২ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম
•১৪ মিলিগ্রাম অক্সালিক এসিড
•৭০ মিলিগ্রাম ফসফরাস
•০.৩ মিলিগ্রাম রিবোফ্লাভিন
•০.৩ মিলিগ্রাম নিয়াসিন
•১৪ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি।

ডালিম ফলের উপকারিতা

ডালিম খাওয়ার উপকারিতা

ডালিম ফলটি আয়ুর্বেদিক ও ইউনানী চিকিৎসায় পথ্য হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। ডালিম ফলে বিউটেলিক এসিড, আরসোলিক এসিড থাকে, এছাড়া আ্যলকালীয় দ্রব্য যেমন- সিডোপেরেটাইরিন, পেপরেটাইরিন, আইসোপেরেটাইরিন, মিথাইলপেরেটাইরিন প্রভৃতি মূল উপাদান থাকায় এটা নানান ধরনের রোগ উপশমকারী হিসেবে প্রমাণিত। কবিরাজী মতানুসারে ডালিম হলো হৃদযন্ত্রের শ্রেষ্ঠ হিতকারী ফল। ডালিম গাছের শিকড়, ছাল ও ফলের খোসা দিয়ে আমাশয় ও উদরাময় রোগের ওষুধ তৈরি হয়। ইহা ত্রিদোষ বিকারের উপশামক, শুক্রাণু বর্ধক, দাহ-জ্বর পিপাসানাশক, মেধা ও বলকারক, অরুচিনাশক ও তৃপ্তিদায়ক। ডালিমের ফুল রক্তস্রাবজনিত প্রদাহে উপকার দেয়।

‘ডালিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা’ প্রবন্ধে ডালিম ফলের বেশ কিছু উপকারিতা তুলে ধরা হলো।

১. রক্তপাত বন্ধ করতে ডালিম ফুল বেশ কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। কখনো শরীরের কোনো অংশ কেটে গেলে, থেঁতলে গেলে অথবা ফেটে গিয়ে রক্তপাত হলে ডালিম ফুল কচলিয়ে ক্ষতস্থানে লাগিয়ে চেপে ধরলে রক্তপাত বন্ধ হয়ে যায়। ফুলর বিকল্প হিসেবে পাতাও ভালো ফলাফল দেয়।

২. অনেকের হঠাৎ নাক দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। নাক দিয়ে রক্ত পড়া রোগের মহৌষধ ডালিম ফুলের রস। নাক দিয়ে রক্তঝরা একটি সাধারণ বিষয়। বহু মানুষের এরকমটা হয়। অনেকের বিনা কারণেও নাক দিয়ে রক্ত ঝরতে পারে। শিশুদের মাঝে এটা লক্ষ্য করা যায় যে— আঘাত পেলে বা কোনো কারণ ছাড়াই যদি নাক দিয়ে রক্ত ঝরে। তখন ডালিম ফুল কচলিয়ে রস বানিয়ে তা নাকে শ্বাসের মাধ্যমে নিলে রক্ত পড়া বন্ধ হয়।

৩. আমাশয় নিরাময়ে ডালিমের খোসা ব্যবহৃত হয়। যারা আমাশয়ের রোগী, তারা ডালিমের খোসা সিদ্ধ করে সেই পানি পানসেই পানি পান করলে আমাশয় নিরাময় হয়। আমাশয় ভালো করতে ডালিমের কাঁচা খোসা ও শুকনা খোসা দুটোই কার্যকর। তাই ডালিম খেয়ে খোসাগুলো ফেলে না দিয়ে শুকিয়ে ঘরে রেখে দেয়া উটিত।

৪. ডালিম গাছের ছাল গুঁড়ো করে শরীরের যে কোনো স্থানের বাগি বা উপদংশে লেপন করলে তা ওই রোগ নিরাময় ভালো কাজ করে। মহিলাদের প্রদররোগ নিরাময়ে ডালিম ফুল উপকারী। চার বা পাঁচটি ডালিম ফুল বেটে মধুর সাথে মিশিয়ে কয়েকদিন খেলে রোগ সেরে যায়।

৫. গর্ভপাত নিরাময়ে ডালিমের গাছের পাতা বেশ উপকারী। অনেক মহিলা আছেন যারা গর্ভসঞ্চারের দুই তিন মাসের মধ্যে গর্ভপাত হয়। কোনো কোনো মহিলার একাধিকবার এরকম হয়ে থাকে। ডালিম গাছের পাতা বেটে মধু ও দই একসাথে মিশিয়ে সেবন করলে গর্ভপাতের আশঙ্কা কিছুটা দূর হয়।

আরও পড়ুন: আনারসের উপকারিতা ও অপকারিতা

৬. ডালিম গাছের শিকড় ক্রিমিনাশক। ক্রিমি আমাদের জাতীয় সমস্যা একটি। ক্রিমির কারণে ছেলে-বুড়ো সবাই নানাবিধ রোগ ও পুষ্টিহীনতায় ভোগে। ডালিম গাছের মূল বা শিকড় থেকে ছাল নিয়ে চূর্ন করে চুনের পানির সাথে মিশিয়ে সেবন করলে খুব সহজে ক্রিমিনাশ হয়।

৭. শিশুদের পেটের রোগ নিরাময়ে ডালিম গাছের ছাল বেশ উপকারী। শিশুরা বিভিন্ন প্রকার পেটের সমস্যায় ভোগে। যেসব শিশু পেট ফুলে থাকা ও বিভিন্ন প্রকার পেটের সমস্যায় ভোগে, তাদেরকে জন্য ডালিম গাছের শিকড় থেকে ছাল নিয়ে গুঁড়ো করে মধুর সাথে মিশিয়ে সেবন করালে ভালো ফল পাওয়া যায়।

৮. ডালিম খেলে শরীরে রক্ত বৃদ্ধি পায়। রক্তশূন্যতা রোগ নিরাময়ে ডালিমের জুড়ি নেই।

৯. ডালিম খেলে ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকে।

ডালিম গাছের ফল, ফলের খোসা, পাতা থেকে শুরু করে শিকড় অবধি কোনোটাই অপ্রয়োজনীয় নয়। আগাগোড়া সম্পূর্ণটাই মানুষের জন্য উপকারী।

ডালিম ফলের অপকারিতা

ডালিম খুবই পুষ্টিকর একটি ফল। খুব কম মানুষই আছে যারা নিয়মিত ডালিম খেতে পারে। কারণ এটা খুবই দামি একটি ফল। অল্প পরিমাণে খেলে এটা কেমন কোনো ক্ষতি করে না। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ আছে যারা বিভিন্ন রোগে রোগ আক্রান্ত। তাদের জন্য ডালিম উপকারের বদলে অপকার বয়ে আনতে পারে।

ডালিম খেলে রক্ত বৃদ্ধি পায়। তাই এলার্জি জনিত রোগীদের জন্য এই ফল না খাওয়াটাই উত্তম। কেননা এই ফল খেলে তার শরীরে গোটা গোটা দেখা দিতে পারে।

ডালিমের উৎপত্তি মধ্যপ্রাচ্যে। যেখানে প্রচুর গরম। স্বাভাবিকভাবেই এই ফল সেখানকার মানুষের জন্য খুবই উপকারী। এর পেছনে একটি রহস্য আছে। কারণ এই ফল খেলে মানুষের শরীর শীতল হয়ে যায়। এক অন্যরকম প্রশান্তি বয়ে আনে। যা মরু অঞ্চলের গরমে মানুষের জন্য আবশ্যক। কিন্তু ডালিমের এই উপকারী গুণটি অনেক মানুষের জন্য অপকারী প্রমাণিত হয়।

যাদের নিম্ন রক্তচাপ রয়েছে তাদের জন্য এই ফল না খাওয়াটাই উত্তম। কেননা শরীর শীতল হয়ে গেলে রক্তচাপ কমে যায়। ফলে রোগ আরো বৃদ্ধি পায়।

এটা পেট ঠান্ডা করার কারণে খাবার হজমে দেরি হয়। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য গ্যাস অথবা এসিডিটি রয়েছে তাদের জন্য এই ফল না খাওয়াটাই ভালো।

এছাড়া যাদের ঠান্ডা লেগেছে বা কাশি তাদের জন্য এই ফলটা না খাওয়াটা ভালো।

সর্বোপরি এই ফলটা খুবই উপদেয়। কিন্তু কিছু কিছু অবস্থায় এই ফলটা বর্জন করা প্রয়োজন।

‘ডালিম খাওয়ার উপকারিতা ও অপকারিতা’ প্রবন্ধটি আশা করব আপনাদের অনেক উপকারে আসবে। সম্পূর্ণ আর্টিকেল পাঠ করার জন্য আপনাদেরকে ধন্যবাদ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top